• ঢাকা
  • রবিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯

১৫ মামলার আসামী যখন থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রকাশিত: নভেম্বর ২৭, ২০২২, ০২:৩৯ পিএম
১৫ মামলার আসামী যখন থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী
ছবি - সংগৃহীত

দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাদক ব্যবসার জোরে কোটি কোটি টাকার পাহাড় গড়েছেন গাজীপুর মহানগর সাবেক ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুদ রানা এরশাদ। অবশ্য তার কার্যক্রমে অসন্তুষ্ট হয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ তাঁকে ০৩-১১-২০১৬ সালে অব্যাহতি দিয়েছিলো। কিন্তু তিনি একটুও শোধরায়নি, খমতার অপ-ব্যবহারে গড়ে তুলেছেন অনেক বাড়ি_ যেগুলো আসলে দখল করা। এক সময় রিকশাভাড়াও জুটত না, এখন চড়েন বিলাসবহুল একাধিক গাড়িতে। আগে কথা বলার আগে সাত-পাঁচ ভাবতেন, এখন তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস হয় না কারও। তার রয়েছে পোষা ক্যাডার বাহিনী তার হয়ে সব কিছু করে। তাদের ভয়ে তটস্থ গাজীপুর-জয়দেবপুরের মানুষজন । এমনকি পুলিশও রেহাই পায়নি তাদের রোষানল ও নির্যাতন থেকে। তিন পুলিশকে কুপিয়ে আহত করার মামলা হলেও সাধারন মানুষ তবুও মুখ খোলার সাহস পায় না।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেপরোয়া উত্থান ঘটে মাসুদ রানা এরশাদ এর। দখল, চাঁদাবাজি ও মাদকের কারবার শুরু করেন । অবৈধ অর্থে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তার  বিরুদ্ধে মোট ১৫ মামলার পাশাপাশি সাধারণ ডায়েরি রয়েছে আরও অর্ধশতাধিক।  হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের জমি থেকে শুরু করে তাদের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও দখল করেছেন।

বায়না দলিল দেখিয়ে মালিকানা দাবি ও হামলা : গাজীপুর মহানগরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের নীলেরপাড়া এলাকার শীতল চন্দ্র মণ্ডল নীলেরপাড়া হাইস্কুলের সিনিয়র শিক্ষক। নীলেরপাড়া মৌজায় সিএস ৮০৪, ৮০৫ ও ৮০৬ নম্বর দাগে শীতল মণ্ডল গংয়ের পৈত্রিক সম্পত্তি রয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ বিঘা। এসব জমি নামজারি, খাজনা থেকে শুরু করে সবকিছু তাদের নিজেদের নামেই করা। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাসুদ রানা এরশাদসহ একটি সিন্ডিকেট একটি বায়না দলিলের বলে মালিকানা দাবি করে শীতলের সম্পত্তির ১০ কাঠা জমিতে খুঁটি পুতে দেয়। শীতল ও তার আত্মীয়স্বজন এই খুঁটি তুলে ফেলে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মাসুদ রানার নেতৃত্বে তার ক্যাডার বাহিনী শীতলের চাচা লালমোহন চণ্ড মণ্ডল, শীতলের ছোট ভাই সতীশ চন্দ্র মণ্ডল ও তাদের ভাতিজি পপি মণ্ডলকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। এ ঘটনায় শীতল চন্দ্রের ছোট ভাই নিখিল চন্দ্র মণ্ডল বাদী হয়ে মাসুদ রানাসহ সাতজনের বিরুদ্ধে জয়দেবপুর থানায় মামলা করেন।

জেনারেটরের ব্যবসা দখল : মহানগরের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ ছায়াবীথি এলাকার জ্ঞান চন্দ্র রাজভরের ছেলে সুমন চন্দ্র রাজভর। ২০০৫ সালে তিনি বেসরকারি তিনটি সংস্থা থেকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এলাকায় জেনারেটরের মাধ্যমে খন্ড কালীন বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজ শুরু করেন। দুই শতাধিক পরিবারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতেন তিনি। এ থেকে যে আয় হতো তা দিয়ে কোনো মতে সংসার চালাতেন তিনি। মাসুদ রানার নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা সুমনকে মারধর করে জেনারেটরের ব্যবসা দখল করে নেয়।

মৎস্য খামারে চাঁদাবাজির চেষ্টা ও হামলা : মহানগরের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর ছায়াবীথি এলাকার মনিরুল ইসলাম গত ছয় বছর ধরে পাশের বরুজা গ্রামের প্রায় ২০ বিঘা জমিতে খামার করে মৎস্য চাষ করছেন।মাসুদ রানা সেই খামার থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। হুমকি দেন, চাঁদা না দিলে খামার দখল করে নেবেন। চাঁদা না দেওয়ায় গত বছরের ১৮ জানুয়ারি ২০১৬ সালে মাসুদ রানার নেতৃত্বে তার অস্ত্রধারী ক্যাডাররা মনিরুলকে গুলি করে। জয়দেবপুর ও ঢাকা মেডিকেলে দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলে তার। এ ঘটনায় মনিরুলের বড় ভাই হাফিজুল বাদী হয়ে মাসুদ রানাসহ আটজনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন।

পুলিশের ওপর হামলা :একটি হত্যা মামলার তদন্তে মাসুদ রানার সম্পৃক্ততা পেয়ে তাকে আসামি করেন জয়দেবপুর থানার সাবেক এসআই মোজাম্মেল হোসেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মাসুদসহ তার ক্যাডার বাহিনী লাঠি ও ইট দিয়ে পিটিয়ে মোজাম্মেলকে আহত করে। মোজাম্মেল হোসেন বাদী হয়ে তাদের আসামি করে আরেকটি মামলা করেন। পরে অবসরে যান তিনি। তার মৃত্যুর পর স্বজনরা দাবি করেন, মাথায় প্রচণ্ড আঘাতের কারণেই মৃত্যু হয়েছে মোজাম্মেলের।

চাঁদাবাজি করার সময় সেলিমকে হত্যা : গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক এলাকার একটি কারখানার ঝুট ব্যবসায়ী জুয়েল মাহমুদের কাছে গত ১ সেপ্টেম্বর ২০১৫সালে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন মাসুদ ও তার সহযোগীরা। টাকা না দেওয়ায় মাসুদের নেতৃত্বে তার ক্যাডার বাহিনী জুয়েলকে মারধর করে। খবর পেয়ে জুয়েলের আত্মীয় মো. সেলিম গিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তখন মাসুদের নির্দেশে তার ক্যাডাররা সেলিমকে গুলি করে। আহত সেলিমকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই ঘটনায় মাসুদসহ ১৯ জনকে আসামি করে কালিয়াকৈর থানায় হত্যা মামলা করা হয়।

জমি দখল করতে গিয়ে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার :২০১১ সালের মার্চে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে গাজীপুরের পূবাইলে খোকন ফিলিং স্টেশনের পশ্চিম পাশে শেখ মকবুল হোসেনের পৈতৃক ১২ শতাংশ জমি দখল করতে গিয়ে র‌্যাবের হাতে অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন মাসুদ। এ ঘটনায় মামলা হয়  মাসুদসহ ৫৬ জনের বিরুদ্ধে। শেখ মকবুল হোসেন বলেন, 'আমার পৈতৃক সম্পত্তি ওরা ভুয়া কাগজপত্রে দখল করতে চেয়েছিল। পরে র‌্যাবের সদস্যরা দুই ভাইসহ অনেককেই গ্রেফতার করেন। সে দিন র‌্যাব পাশে না থাকলে তারা আমার জমি দখলই করে নিত।'

দখলে প্রায়  কোটি কোটি টাকার সম্পদ :অনুসন্ধান করে দেখা যায়, গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে অন্যের বাড়ি এবং জমি দখল করে মালিক সেজে ভোগ-দখল করছেন। নগরীর উত্তর ছায়াবীথি এলাকার শ্মশান এলাকায় মাসুদের রয়েছে তিনতলা বাড়ি, মাধববাড়ীতে আজিমউদ্দিন কলেজের দক্ষিণ পাশে আছে একতলা বাড়ি,  রথখোলা গরুর হাটের পাশে পাঁচ বিঘা অর্পিত সম্পত্তি দখল করে ভাড়া দিয়েছেন তারা। এভাবে নগরীর আনাচে-কানাচে রয়েছে প্রায় অর্ধশত বাড়ি, প্লট, ফসলি জমি, যার মূল্য ১০০ কোটি টাকার বেশি বলে ধারনা।

এরশাদের হামলায় আহত মহানগর ছাত্রলীগ বর্তমান সম্পাদক শেখ মোস্তাক আহমেদ কাজল বলেন,  রাতে পূজামন্ডপ পরিদর্শন শেষে প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের গাড়িতে তুলে দিতে যাই। গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি এ্যাড. ওয়াজউদ্দিন মিয়া ভাইকে গাড়িতে তুলে দিয়ে ফেরার পথে হামলার শিকার হই। গাজীপুর মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাসুদ রানা এরশাদের নেতৃত্বে অস্ত্রধারী ২০-২৫ জন আমাদের উপর এলোপাতাড়ি মারধর করেন। প্রথমে এসেই গুলি করেন এবং আমার সাথে থাকা ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা আমাকে ব্যারিকেড দিয়ে রক্ষার চেষ্টা করেন। এলোপাতাড়ি মারধরে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই, আমার সাথে থাকা বাদল, রনিসহ অনেকেই আহত হন। স্থানীয়রা আমাকে উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে মাসুদ রানা এরশাদ এর মুঠো ফোনে  একাধিক বার ফোন করেও তার কোন সদ উত্তর পওয়া যায়নি।



Side banner