দেশে গত একশ বছরে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সচিবালয়ের নবনির্মিত ২০ তলা অফিস ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ায় ব্যাপক উদ্বেগ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। সরেজমিন পরিদর্শনে ভবনের বিভিন্ন কক্ষে দেয়ালে বড় ধরনের ফাটল, পলেস্তরা খসে পড়া এবং কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফাটলের পেছনে রয়েছে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও নকশা অনুযায়ী কাজ না করার গুরুতর অনিয়ম।
এই ভবনের নির্মাণকাজের ছাড়পত্র দেওয়ার সঙ্গে জড়িত গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইডেন গণপূর্ত বিভাগের সাবেক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী এবং বর্তমানে নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে প্রেষণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এ অথারাইজড অফিসার হিসেবে কর্মরত মো. রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে উঠেছে বিস্তর অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা ও কমিশন গ্রহণ করে তিনি নিম্নমানের মালামাল ব্যবহারের পরও ভবনটি বুঝে নিয়ে ছাড়পত্র দিয়েছেন।
ভূমিকম্পের পর সচিবালয়ের নবনির্মিত ভবনের দশম তলার একাধিক কক্ষে ফাটল দেখা যায়। বিশেষ করে ৯৩০ নম্বর কক্ষের উত্তর পাশের দেয়ালে বড় ফাটল এবং পলেস্তরা খসে পড়ার ঘটনা দৃষ্টিগোচর হয়। একই তলার ১০০ নম্বর কক্ষের সামনের দেয়ালেও ফাটল দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনের ক্ষেত্রে ভূমিকম্প সহনশীল নকশা ও উচ্চমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ এই ভবনে সেই মান বজায় রাখা হয়নি বলেই অল্প সময়ের মধ্যেই কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।
প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একনেক সভায় অনুমোদন পায়। প্রায় ৪৬১ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে দুটি বেজমেন্টসহ ২০ তলা বিশিষ্ট এই ভবনের নির্মাণকাজ গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ হয়। চলতি বছরের মে মাসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ভবনটির কার্যক্রম শুরু করে।
নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ভবনটি বুঝে নিয়ে ঠিকাদারকে ছাড়পত্র দেন তৎকালীন ইডেন গণপূর্ত বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সিডিউল ও মান বজায় না রেখেই ভবনটি বুঝে নেওয়া হয়।
গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ইডেন গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে মো. রাকিবুল হাসান কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রকৃত অর্থে কাজের সুযোগ না দিয়ে নিজেই পরোক্ষভাবে ঠিকাদার হিসেবে কাজ করেছেন। এভাবে গত তিন বছরে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তেজগাঁও গণপূর্ত উপ-বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে শিল্প প্লট বরাদ্দ, ভবন নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তেজগাঁও ভূমি ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ভুয়া ভেরিয়েশন দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিয়ে বিপুল অঙ্কের কমিশন গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র মতে, এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে মো. রাকিবুল হাসান ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি, কুমিল্লা শহরে বড় পরিসরের জমি এবং গাজীপুরে প্রায় ৩০ একর জমির ওপর একটি রিসোর্ট নির্মাণ করছেন। এছাড়া সিঙ্গাপুরে হুন্ডির মাধ্যমে শত কোটি টাকা পাচারের গুঞ্জনও রয়েছে গণপূর্ত অঙ্গনে।
সম্প্রতি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে মো. রাকিবুল হাসানকে নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে প্রেষণে রাজউকে অথারাইজড অফিসার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট অনেকেই এই পদায়নকে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
তাদের আশঙ্কা, যিনি সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবনের মান নিয়ে আপস করেছেন, তার হাতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন থাকলে সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সচেতন মহল মনে করছে, সচিবালয়ের মতো সংবেদনশীল স্থাপনায় এ ধরনের অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তারা অবিলম্বে প্রকল্পের নির্মাণমান, ছাড়পত্র প্রদান প্রক্রিয়া, আর্থিক লেনদেন এবং মো. রাকিবুল হাসানের সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখতে স্বাধীন তদন্ত ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
আপনার মতামত লিখুন :