দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাব গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত, এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে। রবিবার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রে সদস্য হওয়ার জন্য ন্যূনতম শুদ্ধাচার ও নৈতিকতার শর্তের অভাব রয়েছে, যার ফলে অপরাধীরাও সহজেই দলে প্রবেশ করতে পারছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চাঁদাবাজি, মানব পাচার, চোরাচালান, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা এবং যৌন ব্যবসার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক দলে অন্তর্ভুক্তির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে লক্ষণীয়। এমনকি, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থীর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অপরাধে এক বা একাধিক মামলা থাকার তথ্য উঠে এসেছে, যা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অন্ধকার দিক তুলে ধরে। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে, যা অর্থ ও পেশিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
টিআইবি’র গবেষণা অনুযায়ী, ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকার খেলা এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে কেবল ক্ষমতা দখলের এক ব্যবসায়িক মডেলে রূপান্তরিত করছে। দলগুলো অর্থ ও পেশিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা, ব্যয় নির্বাহ, আধিপত্য বিস্তার এবং নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের মতো কারণে। অন্যদিকে, অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনকারী ও পেশিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরাও নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয়ে প্রবেশের চেষ্টা করে থাকেন। তুলনামূলকভাবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের প্রবেশের ঘটনা বেশি লক্ষণীয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনী ব্যয়ের লাগামহীনতাও টিআইবির গবেষণায় গুরুতর অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছে। দলগুলোর গঠনতন্ত্রে মনোনীত প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় পরিকল্পনা, অর্থের উৎস, ব্যয় তদারকি এবং আর্থিক প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্ধারিত ব্যয়সীমার চেয়ে প্রার্থীরা গড়ে ১৬৯.৫ শতাংশ বেশি ব্যয় করলেও দল থেকে তাঁদের প্রার্থিতা দেওয়া হয়েছে, যা নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রে দলগুলোর কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহির অভাব প্রমাণ করে। টিআইবি একজন নেতার বক্তব্য তুলে ধরেছে, যেখানে তিনি বলেছেন, কিছু এলাকায় নির্বাচনের ব্যয়ের ক্ষেত্রে একদিনেই ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়। অন্য একজন নেতার ভাষ্য, নির্বাচনের মাঠে এক হাজার টাকার নোট হচ্ছে সর্বনিম্ন। জেলা পর্যায়ের একজন নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় দলের একজন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় ৫০ কোটি টাকার বেশি ছিল, যা নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করে।
সংসদ সদস্যদের সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টিও প্রতিবেদনে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদের ৬৭ জন সদস্য এবং তাঁদের পরিবারের ৪৪ জন সদস্যের সম্পদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাঁচ বছরে তাঁদের সম্পদের ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বোচ্চ একজন সংসদ সদস্যের নিজের সম্পদ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদ যথাক্রমে ৫ হাজার ৪৭০ শতাংশ ও ৩৮ হাজার ৪২৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবোধক। টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে নেতা-কর্মীরা সম্পদ অর্জন করলেও দল থেকে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না, ক্ষেত্রবিশেষে লঘু দণ্ড দেওয়া হয়।
জবাবদিহির ঘাটতি ও দলীয় কাঠামোর দুর্বলতাও এই গবেষণায় উঠে এসেছে। ক্ষমতায় থাকা বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচনী আচরণবিধিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান লঙ্ঘন করলেও দলগুলোর গঠনতন্ত্রে এ বিষয়ে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট বিধান নেই। কিছু মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচনী হলফনামায় সম্পদ, ঋণ, ব্যবসায়িক স্বার্থ কিংবা বিদেশি নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত তথ্য গোপন করা অথবা ভুল ও অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন ও জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আইন ও বিধিমালা থাকলেও অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা, রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শক্তিশালী আইনগত কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে।
নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও ঘাটতি লক্ষণীয়। আইনগত বাধ্যবাধকতা ও দলগুলোর অঙ্গীকার থাকলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। দলীয় কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক চর্চা, তৃণমূল পর্যায়ের অংশগ্রহণ এবং নারী কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির ঘাটতির কারণে দলগুলোতে একক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, পরিবারতন্ত্র, কর্তৃত্বপরায়ণতা, অভিজাততন্ত্র ও পুরুষতান্ত্রিকতা গভীর হচ্ছে, যা আধুনিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
প্রতিবেদনের সার্বিক পর্যবেক্ষণে টিআইবি জানিয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসনের প্রতিটি নির্দেশক—তথ্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক চর্চা, অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি এবং অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়। এসব অর্থের ব্যবস্থাপনা অনেক ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয় এবং ব্যক্তিনির্ভর থাকে। ফলে স্বচ্ছতার ঘাটতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং বাস্তবতার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ করা যায়। এ পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসন নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ সংস্কার অপরিহার্য। এই সংস্কারের দায়-দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে বলে প্রতিবেদনে জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :