• ঢাকা
  • সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩

ভুয়া বিয়ের ফাঁদে মিয়ানমারের নারীদের চীনে পাচার, উদ্বেগ বাড়ছে মানবপাচার নিয়ে


FavIcon
অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম
ভুয়া বিয়ের ফাঁদে মিয়ানমারের নারীদের চীনে পাচার, উদ্বেগ বাড়ছে মানবপাচার নিয়ে

মিয়ানমারে চলমান সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে নারীদের চীনে পাচারের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। মানবপাচারকারীরা চাকরি, উচ্চ আয়ের প্রতিশ্রুতি কিংবা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের সীমান্ত পার করে নিয়ে গিয়ে তথাকথিত ‘বধূ’ হিসেবে বিক্রি করছে বলে বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতি এবং মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে মানবপাচারের ৮০টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১৪টি মামলায় ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে নারীদের বিদেশে, বিশেষ করে চীনে পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, মানবপাচারকারীরা বিপুল অঙ্কের অর্থের লোভ দেখিয়ে নারীদের টার্গেট করছে। এক ঘটনায় মান্দালয়ের ২০ বছর বয়সী এক তরুণীকে চীনা নাগরিকের সন্তান জন্ম দিলে মোটা অঙ্কের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। অন্য একটি ঘটনায় ইয়াঙ্গুনের পোশাকশিল্পে কর্মরত এক নারীকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চীনা নাগরিককে বিয়ে করতে রাজি করানোর বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

আরেকটি ঘটনায় রাজধানী নেপিডোর এক তরুণীকে বিদেশে চাকরির সুযোগের কথা বলে চীনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে চীনের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে কয়েক মাস আটক রাখে।

তদন্তে আরও জানা গেছে, স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে বড় অঙ্কের দেনমোহর দেখিয়ে চীনা নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের বিদেশে পাঠানোর ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অপরাধচক্র এখন আর কেবল সীমান্তবর্তী এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি কিংবা নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারীদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।

সম্প্রতি তাইওয়ানের নিউ তাইপেই শহরে পরিচালিত এক অভিযানে মানবপাচারের অভিযোগে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং মিয়ানমারের নয়জন নারীকে উদ্ধার করা হয়। তদন্তে জানা যায়, ২০২৪ সাল থেকে চক্রটি মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে নারীদের বিদেশে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক শ্রম ও যৌন শোষণের শিকার করছিল।

অন্যদিকে, গত মাসে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে চীনা মানবপাচার চক্রের এক মূল সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তে অভিযোগ ওঠে, চক্রটি ২০২৪ সাল থেকে অন্তত ২০ জন মিয়ানমারের নারীকে চীনে পাচার করেছে। একই সঙ্গে ইয়াঙ্গুনে চীনা নাগরিকদের জন্য অবৈধভাবে পাত্রী খুঁজে দেওয়ার কার্যক্রমেও তারা জড়িত ছিল।

চীনা কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে মিয়ানমারে অবস্থিত চীনা দূতাবাস সীমান্ত পেরিয়ে বিয়ের উদ্দেশ্যে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের নাগরিকদের সতর্ক করে জানায়, এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে অনেকেই আইনি জটিলতায় পড়ছেন।

মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে অর্থনৈতিক দুরবস্থা, সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির ফলে নারীরা মানবপাচারকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। তাদের মতে, মানবপাচার রোধে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ভুয়া চাকরি ও বিয়ের প্রলোভন সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এখন অত্যন্ত জরুরি।


Side banner
Link copied!