ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলের টাইগ্রে অঞ্চলে সরকারি বাহিনী ও আঞ্চলিক যোদ্ধাদের মধ্যে কয়েক দিনের তীব্র লড়াইয়ে অন্তত ৫২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। সংঘর্ষে আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ৭০০ জনের বেশি মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেডসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের (এমএসএফ)।
হাসপাতাল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, টাইগ্রের আলামাতা শহর ও আশপাশের এলাকায় শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত তীব্র লড়াই হয়েছে। সংঘর্ষে ভারী কামান ও বিস্ফোরক ব্যবহারের কারণে আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী, গবাদিপশু চরানো ব্যক্তি এবং মাত্র তিন দিন বয়সী একটি শিশুও রয়েছে বলে আলামাতা জেনারেল হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানিয়েছেন।
সংঘর্ষের পর আলামাতা শহরের নিয়ন্ত্রণ সরকারি বাহিনী নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে শহরের বিভিন্ন সড়কে সামরিক ট্যাংক দেখা গেছে। সরকারি বাহিনী এখন টাইগ্রে অঞ্চলের প্রধান শহর মেকেলের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
টাইগ্রে অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষ ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা চলছিল। গত সপ্তাহে সেই উত্তেজনা সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নেয়। ২০২২ সালে দুই বছরের গৃহযুদ্ধের অবসানে যে শান্তিচুক্তি হয়েছিল, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির জন্য সেই চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ পরস্পরের বিরুদ্ধে তুলেছে দুই পক্ষ।
সংঘর্ষের কারণে টাইগ্রে ও আশপাশের এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ইন্টারনেট ও টেলিফোন সংযোগ বন্ধ থাকায় সরাসরি তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাংকিং সেবাও বন্ধ রয়েছে। ফলে সংঘর্ষ থেকে পালিয়ে আসা মানুষ খাদ্য, অর্থ, যোগাযোগ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা পেতে সমস্যায় পড়ছেন।
আলামাতার একটি স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আশপাশের এলাকার বহু মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় হেঁটে শহরে প্রবেশ করছেন। কিন্তু শহরেও বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ফোন ও ব্যাংকিং সেবা সচল না থাকায় মানবিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।
এদিকে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য লালিবেলা শহরেও সংঘর্ষের প্রভাব পড়েছে। শহরটিতে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কয়েক ডজন বিদেশি পর্যটক আটকা পড়েছেন। বিমানবন্দর বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা সহজে শহর ছাড়তে পারেননি।
লালিবেলায় অবস্থানরত এক ব্রিটিশ পর্যটক জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরে তারা গুলির শব্দ ও ভারী কামানের আওয়াজ শুনেছেন। শহরে সামরিক বাহিনীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে বলেও তিনি জানান। পরিস্থিতির মধ্যে সোমবার সামরিক হেলিকপ্টারে করে ১৪ জন ইসরায়েলি পর্যটককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর আগে আরও কয়েকজন পর্যটক গাড়িবহরের মাধ্যমে শহর ছেড়েছেন।
লালিবেলায় এখনো যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটক অবস্থান করছেন। সংঘর্ষের কারণে বিমান যোগাযোগ সীমিত থাকায় তাদের অনেকে আটকা পড়ে আছেন।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সূচনা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ) দাবি করেছে, কেন্দ্রীয় সরকারের হামলার জবাবে তারা পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে। অন্যদিকে ইথিওপিয়ার সরকার বলছে, টাইগ্রের যোদ্ধারাই প্রথম হামলা চালায় এবং বিমানবন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সংঘর্ষ শুরু করে।
সংঘাতে আমহারা অঞ্চলের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীও জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই গোষ্ঠী টাইগ্রের যোদ্ধাদের সঙ্গে জোট করেছে। পাশাপাশি পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী ইরিত্রিয়া জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ইথিওপিয়া ইরিত্রিয়ার বিরুদ্ধে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তার অভিযোগ তুললেও দেশটি তা অস্বীকার করেছে।
টাইগ্রে অঞ্চলের সংঘর্ষের কারণে আফার এলাকাতেও লড়াই ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। ইথিওপিয়ার জন্য আফার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অঞ্চলটি দেশটির সঙ্গে জিবুতি ও বন্দরগুলোর স্থল যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এদিকে টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় টাইগ্রের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আদ্দিস আবাবাভিত্তিক টাইগ্রে ব্রডকাস্টিং সার্ভিস টেলিগ্রামের মাধ্যমে ভিডিও বার্তা সংগ্রহ করে স্যাটেলাইট টেলিভিশনে প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পরিবারগুলোর সঙ্গে খবর আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ সহায়ক হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আপনার মতামত লিখুন :