বাংলাদেশকে এখন ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগর ও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কথা তুলে ধরে ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেছেন, বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্ককে প্রচলিত দাতা ও সহায়তা গ্রহণকারীর কাঠামোর বাইরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর দ্বিতীয় দিনের কর্ম অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের পাশাপাশি বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও বাংলাদেশের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম ৩০টি অর্থনীতির একটিতে পরিণত হতে পারে বলেও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
মাইকেল মিলার জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় অতিক্রম করছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ, রাজনৈতিক পরিবর্তন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে দেশটির সামনে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি।
বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ইইউর দেওয়া ‘অস্ত্র ছাড়া সবকিছু’ বাণিজ্য সুবিধা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করতে দুই পক্ষের সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
রাষ্ট্রদূত জানান, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের সফল উত্তরণে সহযোগিতার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার সম্ভাবনাও যাচাই করছে ইইউ। এলডিসি থেকে এখনো উত্তরণ সম্পন্ন করেনি, এমন কোনো দেশের সঙ্গে এ ধরনের প্রস্তাব ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এবারই প্রথম দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন মাইকেল মিলার। তার মতে, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, সামাজিক রূপান্তর এবং ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশের আধুনিকায়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়ে ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশকে একটি উন্মুক্ত, সার্বভৌম, স্থিতিশীল ও আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে নিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে।
বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সংবিধান সংস্কারের বিষয়টিও তুলে ধরেন মাইকেল মিলার। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে সংবিধান সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ শুরু হলেও সেই প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ আয়োজিত তিন দিনব্যাপী বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
আপনার মতামত লিখুন :