দেশের বাজারে আবারও বাড়ানো হয়েছে স্বর্ণের দাম, যা সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারী সবার মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানের ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের গহনার দাম এক ধাক্কায় ৩ হাজার ২৬৬ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের গহনার নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা, যা দেশের স্বর্ণের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ মূল্য।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং কমিটির এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। নতুন এই মূল্য সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল ১০টা থেকে সারা দেশে কার্যকর হয়েছে, যা স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের জন্যও নতুন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবী সোনার দাম বাড়ার কারণে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তেজাবী সোনা বলতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত স্বর্ণের দামকে বোঝানো হয়, যা ডলারের বিনিময় হার, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ মজুদের মতো নানা উপাদানের উপর নির্ভরশীল। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে এই তেজাবী সোনার দাম বৃদ্ধি পায়, তখন দেশের স্থানীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়ে এবং জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী দাম সমন্বয় করে থাকে।
স্বর্ণের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে যারা বিয়ে বা অন্য কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য স্বর্ণালংকার কেনার পরিকল্পনা করছিলেন, তাদের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা। মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক ক্রেতাই হয়তো তাদের বাজেট পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হবেন। অন্যদিকে, যারা স্বর্ণকে একটি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন, তাদের জন্য এটি কিছুটা আশাব্যঞ্জক হতে পারে, কারণ মূল্যবৃদ্ধি তাদের পূর্বের বিনিয়োগের মূল্য বাড়াবে। তবে, নতুন করে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উচ্চ মূল্য একটি প্রতিবন্ধকতা হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা, ডলারের বিপরীতে বিভিন্ন মুদ্রার দরপতন এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের চাহিদা ও দাম উভয়ই বেড়েছে। এই বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের বাজারেও স্বর্ণের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরেই স্বর্ণের দামে এক ধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে প্রায়শই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।
স্বর্ণ শুধু একটি অলংকার নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। উৎসব-পার্বণ থেকে শুরু করে পারিবারিক বিভিন্ন আয়োজনে স্বর্ণের উপস্থিতি অপরিহার্য। এই মূল্যবৃদ্ধি হয়তো স্বল্প মেয়াদে ক্রয়ক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এর চাহিদা খুব একটা কমবে বলে মনে হয় না। তবে, ক্রেতাদের মধ্যে কম ওজনের বা হালকা ডিজাইনের অলংকারের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে।
বাজুসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়, যাতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই ন্যায্য মূল্য পান। তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বর্ণের বাজার যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা নিকট ভবিষ্যতে স্থিতিশীল হবে কিনা, তা বলা কঠিন।
আপনার মতামত লিখুন :