দারিদ্র্য থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে: আলী খামেনির উত্থানের গল্প
আন্তর্জাতিক ডেক্স :
প্রকাশিত: মার্চ ১, ২০২৬, ১০:৩৮ পিএম
ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল এক ধর্মপ্রাণ কিন্তু দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন আলী খামেনি। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার বাবা সৈয়দ জওয়াদ খামেনি ছিলেন স্থানীয়ভাবে পরিচিত শিয়া আলেম এবং মা খাদিজা মির্দামাদী ছিলেন ধর্মনিষ্ঠ গৃহিণী।
শৈশবেই মায়ের কাছ থেকে কোরআন তেলাওয়াত ও প্রাথমিক ধর্মশিক্ষা লাভ করেন তিনি। পারিবারিক আর্থিক সংকট এতটাই তীব্র ছিল যে, কখনো কখনো না খেয়েই ঘুমাতে হতো—এমন অভিজ্ঞতার কথাও তিনি স্মৃতিচারণায় উল্লেখ করেছেন।
চার বছর বয়সে বড় ভাইয়ের সঙ্গে স্থানীয় মক্তবে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে সাধারণ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও দুর্বল দৃষ্টিশক্তির কারণে শুরুতে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েন। বিষয়টি ধরা পড়ার পর চশমা ব্যবহার শুরু করলে তার মেধা বিকশিত হয় এবং দ্রুত তিনি সেরা শিক্ষার্থীদের একজন হয়ে ওঠেন।
পিতার ইচ্ছায় উচ্চ বিদ্যালয়ে না গিয়ে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য পবিত্র নগরী কোমে পাঠানো হয় তাকে। সেখানে তিনি শিয়া ধর্মতত্ত্বে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। কৈশোর থেকেই সাহিত্য, কবিতা ও উপন্যাসের প্রতি তার গভীর অনুরাগ জন্মে। টলস্টয় ও ভিক্টর হুগোর মতো বিশ্বখ্যাত লেখকদের রচনা পড়েছেন বলে উল্লেখ রয়েছে তার আত্মস্মৃতিতে।
খোমেনির নেতৃত্বে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যুক্ত হন খামেনি। ১৯৬০-এর দশক থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে বিরোধী রাজনীতিতে জড়ান এবং একাধিকবার গ্রেপ্তার হন।১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর তিনি দ্রুত রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসেন। প্রথমে বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পান, পরে উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সংগঠনে ভূমিকা রাখেন।
১৯৮১ সালে বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি; ওই হামলায় তার ডান হাত আংশিকভাবে অবশ হয়ে যায়। একই বছর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী রাজাই নিহত হলে খামেনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং টানা আট বছর দায়িত্ব পালন করেন।১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তার নেতৃত্ব বৈধতা পায় এবং প্রধানমন্ত্রী পদ বিলুপ্ত করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা পুনর্বিন্যাস করা হয়।তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে রাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র কৌশলে প্রভাব বিস্তার করেন। সাম্প্রতিক সামরিক হামলায় তার মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এক ধর্মশিক্ষার্থী থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর এই যাত্রা ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত লিখুন :