জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহের ঘাটতির চাপে রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে উচ্চমূল্য বজায় রয়েছে। শাকসবজি থেকে শুরু করে ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, মাছ-মাংস—প্রায় সব পণ্য কিনতেই বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে ক্রেতাদের। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সয়াবিন তেল ও চিনি বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। ফলে সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সীমিত আয়ের মানুষ।
শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করলেও দাম এখনো সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। রাজধানীর দুয়ারিপাড়া, মিরপুর-৬ ও পল্লবী বাজার ঘুরে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) এমন চিত্র দেখা গেছে। এসব বাজারে শিম, বেগুন, করলা, বরবটি, ঝিঙা ও ঢেঁড়সের মতো সবজি কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগাম শিমের দাম কোথাও কোথাও ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। গাজর বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা এবং টমেটো ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজিতে। কাঁচামরিচের দামও ১২০ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে রয়েছে।
তবে পেঁপে, মুলা ও কয়েক ধরনের মৌসুমি সবজি তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে পণ্যের সরবরাহ থাকলেও দাম বেশি হওয়ায় কেনাকাটা কমিয়ে দিচ্ছেন অনেকে। আগে একসঙ্গে কয়েক ধরনের সবজি এক কেজি করে কিনলেও এখন কেউ আধা কেজি করে কিনছেন, আবার কেউ প্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া অন্য কিছু কেনা বাদ দিচ্ছেন।
দুয়ারিপাড়া বাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুজ্জামান সোহেল বলেন, প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেশি। ভালো মানের অনেক সবজি ৮০ থেকে ১০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। শীত আসার আগে দাম কমবে বলে আশা করলেও বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
বিক্রেতাদের ভাষ্য, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে নতুন মৌসুমের শীতকালীন সবজির সরবরাহ এখনো পর্যাপ্ত নয়। আগের মৌসুমের সবজির সরবরাহ কমে আসায় বাজারে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যও বিঘ্নিত হয়েছে।
মিরপুর-৬ বাজারের সবজি বিক্রেতা খাদিমুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে বেগুনের কেজি ১০০ টাকা এবং অধিকাংশ সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাঁর আশা, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়লে দাম কমতে পারে।
সবজির পাশাপাশি ভোজ্যতেলের বাজারেও বাড়তি দামের চাপ রয়েছে। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত খুচরা মূল্য ২০৪ টাকা হলেও বিভিন্ন দোকানে তা ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও বোতলজাত তেলের সংকটের কথাও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ২২০ টাকা এবং পাম তেল ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এক কেজি প্যাকেটজাত চিনির গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১১০ টাকা লেখা থাকলেও বাজারে তা ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো দোকানে প্যাকেট খুলে খোলা চিনি হিসেবেও বিক্রি করা হচ্ছে। পাইকারি পর্যায়ে বেশি দামে পণ্য কেনা এবং সরবরাহের ঘাটতিকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন ব্যবসায়ীরা।
খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, সয়াবিন তেলের সরবরাহ নিয়মিত নয়। পাশাপাশি পণ্যটি বিক্রি করে মুনাফাও কমে গেছে। আগে প্রতি লিটার বোতলজাত তেলে তিন থেকে পাঁচ টাকা লাভ হলেও এখন তা কমে প্রায় এক টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
পল্লবী বাজারের হালিম জেনারেল স্টোরের রাজিব হোসেন বলেন, পাঁচ লিটার তেলের বোতল বিক্রি করে তাঁদের লাভ হয় মাত্র পাঁচ টাকা। তাঁর মতে, একই পরিমাণ অর্থ অন্য পণ্যে বিনিয়োগ করলে তুলনামূলক বেশি লাভ পাওয়া যায়। এর ওপর কোম্পানিগুলো নিয়মিত তেল সরবরাহ না করায় ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে গত সপ্তাহের তুলনায় পেঁয়াজের দাম কেজিতে প্রায় পাঁচ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে ভালো মানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। আটা প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং ময়দা ৭০ থেকে ৮০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ডিমের দামে বাজারভেদে পার্থক্য দেখা গেছে। কোথাও ফার্মের মুরগির ডিমের ডজন ১৪০ টাকা, আবার কোথাও ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা। পাড়া-মহল্লার দোকানে চারটি ডিম কিনতে ক্রেতাদের প্রায় ৫৫ টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
মুরগির বাজারে ব্রয়লার প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো স্থানে দাম ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। সোনালি মুরগির কেজি ৩১০ থেকে ৩২০ টাকা এবং গরুর মাংস প্রায় ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছের বাজারেও দামের চাপ অব্যাহত রয়েছে। তেলাপিয়া প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২২০ থেকে ২৩০ টাকা এবং রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাবদা মাছের দাম ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং ট্যাংরা মাছের কেজি প্রায় ৭০০ টাকা। আকার ও মানভেদে চিংড়ির দাম এক হাজার থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। বড় রুই, দেশি কই, বাইম ও শোল মাছ কিনতে কেজিপ্রতি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বা তারও বেশি গুনতে হচ্ছে। সরবরাহ, আকার এবং মাছ জীবিত না মৃত—এসব বিষয়ের ওপর দাম নির্ভর করে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি উৎপাদন খরচ, মৌসুমি সরবরাহ, পাইকারি বাজারের দাম, মজুদ ও বিতরণব্যবস্থা এবং খুচরা পর্যায়ের প্রতিযোগিতার মতো বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই শুধু জ্বালানি তেলের দাম বাড়াকেই সব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশেষ করে ভোজ্যতেল ও চিনির ক্ষেত্রে সরবরাহের ঘাটতি এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। উৎপাদক ও পরিবেশক পর্যায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে কি না, খুচরা বিক্রেতারা কী দামে পণ্য কিনছেন এবং নির্ধারিত দামের অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে কেন—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি জরুরি।
আগামী কয়েক সপ্তাহে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়লে দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উৎপাদন এলাকা থেকে রাজধানীর বাজার পর্যন্ত পরিবহন ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা তদারকি না করলে সরবরাহ বৃদ্ধির সুফল ক্রেতারা পুরোপুরি পাবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
আপনার মতামত লিখুন :