• ঢাকা
  • শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বাকেরগঞ্জে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে বয়স জালিয়াতি, ভুয়া সনদ ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রকাশিত: মে ২২, ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম
বাকেরগঞ্জে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে বয়স জালিয়াতি, ভুয়া সনদ ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম শ্যামপুর বিএম আলিম দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক মোখলেছুর রহমান হাওলাদার ওরফে “সাহেব আলী মাস্টার”-এর বিরুদ্ধে ভয়ংকর বয়স জালিয়াতি, ভুয়া শিক্ষাগত সনদ, একাধিক জন্মতারিখ ব্যবহার, জাল ভোটার পরিচয়পত্র, প্রতারণা এবং সরকারি চাকরির নীতিমালা লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় চরম উত্তেজনা, ক্ষোভ ও ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া তথ্য, জাল কাগজপত্র ও একাধিক পরিচয় ব্যবহার করে তিনি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। একই সঙ্গে জমি সংক্রান্ত দলিল জালিয়াতি, অন্য ব্যক্তিকে দিয়ে পরীক্ষা দেওয়া, পরিচয় গোপন এবং বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন নামে পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মোখলেছুর রহমান হাওলাদার, পিতা মৃত রাজন উদ্দিন হাওলাদার, সাং- বিরঙ্গল, ডাকঘর- শ্যামপুর, উপজেলা- বাকেরগঞ্জ, জেলা- বরিশাল। তার জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটার তালিকা, শিক্ষাগত সনদ, দলিলপত্র ও পারিবারিক তথ্য বিশ্লেষণে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভোটার তালিকার তথ্যানুযায়ী, জেলাঃ বরিশাল, উপজেলাঃ বাকেরগঞ্জ, ইউনিয়নঃ রঙ্গশ্রী, ভোটার এলাকা কোডঃ ০৮১৪, ভোটার এলাকা নামঃ বিরঙ্গল। সেখানে মোখলেছুর রহমানের ভোটার সিরিয়াল নং- ২৪৩, ভোটার স্লিপ নং- ০৬০৮১৪৫০০৮১২ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নং- ১০০৫১৩২৪৩৪। পিতার নাম রাজন উদ্দিন হাওলাদার, মাতার নাম রহিম জান বিবি, পেশা শিক্ষক এবং জন্মতারিখ ১৫/০২/১৯৭২ উল্লেখ রয়েছে।
একই ভোটার তালিকায় তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমের ভোটার সিরিয়াল নং- ২৬৫, ভোটার নং- ০৬০৮১৪৫০০৮১৪ এবং জন্মতারিখ ০৩/০৫/১৯৭৩ উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে বড় ছেলে মোঃ মোজাম্মেল হকের ভোটার সিরিয়াল নং- ৩২৮, ভোটার স্লিপ নং- ০৬০৮১৪৫০১০১৭ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নং- ৪১৬০৪০৩৬৭৩। সেখানে জন্মতারিখ ০১/০৩/১৯৭৮ উল্লেখ করা হয়েছে।
এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, মোখলেছুর রহমানের জন্ম ১৫/০২/১৯৭২ এবং তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমের জন্ম ০৩/০৫/১৯৭৩ হলেও তাদের বড় ছেলে মোজাম্মেল হকের জন্ম ০১/০৩/১৯৭৮। সে হিসাবে মোখলেছুর রহমান জন্মের মাত্র ৬ বছরের মাথায় এবং ফাতেমা বেগম জন্মের মাত্র ৫ বছরের মাথায় সন্তানের পিতা-মাতা হয়েছেন-যা বাস্তবতা, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মানবিক বয়সের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাবি স্থানীয়দের।
অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষাগত নথিতেও মোখলেছুর রহমানের একাধিক জন্মতারিখ ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৮৩ সালের দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে, রোল নং- ১৬৭৩৪, রেজিস্ট্রেশন নং- ২৫০৪৭, সেশন- ১৯৮১/৮২-এ তার জন্মতারিখ ০৫/০২/১৯৭০ উল্লেখ রয়েছে। সেখানে তার নাম “মোখলেছুর রহমান হাওলাদার” এবং পিতার নাম “রাজন আলী হাওলাদার” লেখা হয়েছে।
পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে, রোল নং- ২৩১৮২, রেজিস্ট্রেশন নং- ৯৩৫৮, সেশন- ১৯৮৪/৮৫-এ তার জন্মতারিখ ১৫/০২/১৯৭২ উল্লেখ করা হয়। ফলে একই ব্যক্তির শিক্ষাগত নথিতে দুই ধরনের জন্মতারিখ পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়রা আরও দাবি করেন, ১৯৮৩ সনের ১০-০৮-১৯৮৩ তারিখের ২৫০০/১০ নম্বর দলিলেও “সাহেব আলী” নাম ব্যবহার করা হয়েছে। একই ব্যক্তি বিভিন্ন জায়গায় “মোখলেছুর রহমান”, “আব্দুল মোখলেছ রহমান” এবং “সাহেব আলী” নাম ব্যবহার করায় পুরো বিষয়টি আরও রহস্যজনক হয়ে উঠেছে।
এছাড়া সাব-কবলা দলিল নং- ৪৯৬৪, তারিখ- ১৬/১০/১৯৫৭ অনুযায়ী “আব্দুল মোখলেছ রহমান হাওলাদার” নাম পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি ১৯৫৭ সালের দলিলে উল্লেখিত ব্যক্তি বর্তমান মোখলেছুর রহমান হয়ে থাকেন, তাহলে সে হিসাবে ওই সময় তার বয়স আনুমানিক ১৭ বছর বা তার বেশি হওয়ার কথা। সে হিসেবে ১৯৮৬ সালে তার বয়স দাঁড়ায় প্রায় ৪৬ বছর। অথচ একই ব্যক্তি ১৯৮৬ সালের দাখিল পরীক্ষার নথিতে জন্মতারিখ দেখিয়েছেন ১৫/০২/১৯৭২, যা অনুযায়ী তখন তার বয়স হওয়ার কথা মাত্র ১৪ বছর।
স্থানীয়দের দাবি, একজন ব্যক্তি একই সময়ে কখনও ১৪ বছর বয়সী ছাত্র এবং প্রায় মধ্যবয়সী ব্যক্তি হতে পারেন না। বিষয়টি স্পষ্টতই বয়স জালিয়াতি, পরিচয় বিভ্রান্তি ও রাষ্ট্রীয় নথি জালিয়াতির ইঙ্গিত বহন করে।
বাংলাদেশ সরকারের প্রচলিত চাকরি নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ধারিত অবসর বয়স ৫৯ থেকে ৬০ বছর। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়স, বৈধ কাগজপত্র, নিবন্ধন ও সঠিক পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য বাধ্যতামূলক। কোনো ব্যক্তি ভুয়া জন্মতারিখ, জাল সনদ, ভিন্ন পরিচয় বা মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে সরকারি বা এমপিওভুক্ত চাকরিতে প্রবেশ করলে তা রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা ও দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী অভিযুক্ত মোখলেছুর রহমান হাওলাদার বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন জন্মতারিখ ব্যবহার করে কখনও অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্র, আবার কখনও অধিক বয়সী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় প্রদান করেছেন। একদিকে ১৯৮৬ সালের দাখিল পরীক্ষার নথিতে তিনি নিজেকে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, অন্যদিকে বিভিন্ন দলিল ও স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী তার প্রকৃত বয়স অনেক বেশি হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ভোটার তালিকা ও পারিবারিক তথ্য বিশ্লেষণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যেখানে দেখা যায়, তিনি জন্মের মাত্র ৬ বছরের মাথায় এবং তার স্ত্রী জন্মের মাত্র ৫ বছরের মাথায় সন্তানের পিতা-মাতা হয়েছেন, যা বাস্তবতা, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মানবিক বয়সের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া জন্মতারিখ, জাল সনদ, একাধিক পরিচয় ও সন্দেহজনক নথিপত্র ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। একই সঙ্গে অন্য ব্যক্তিকে দিয়ে পরীক্ষা দেওয়া, দলিল জালিয়াতি, পরিচয় গোপন, জমি সংক্রান্ত প্রতারণা এবং প্রভাব খাটিয়ে চাকরি গ্রহণের অভিযোগও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু একটি ব্যক্তিগত জালিয়াতির অভিযোগ নয়; বরং সরকারি চাকরি ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রশাসন, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় নথিপত্র ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাই বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, মোখলেছুর রহমান “সাহেব আলী মাস্টার” নামেও এলাকায় পরিচিত। তিনি পশ্চিম শ্যামপুর মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক নিজাম্মিল কাদেরের অষ্টম শ্রেণির সহপাঠী ছিলেন। এছাড়া তিনি শ্যামপুর ছালাম মাওলানার মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সোবাহান ডাক্তার এবং মোজাহেদিয়া মাদ্রাসার সাবেক সুপার আঃ গনি মাওলানার ভগ্নিপতি বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
বর্তমানে তিনি ছালাম মাওলানার মাদ্রাসায় ইবতেদায়ী বিভাগের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, তিনি নিয়মিত ক্লাস না নিয়ে মসজিদে ঘুমিয়ে সময় কাটান এবং দায়িত্ব পালন না করেই সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন।
অন্যদিকে তার সন্তানদের শিক্ষাগত নথিতেও অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। ১৯৯৫ সালের দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে বড় মেয়ে খাদিজা আক্তারের জন্মতারিখ ০৫/০২/১৯৮০ এবং ছোট মেয়ে রহিমা আক্তারের জন্মতারিখ ০৭/০২/১৯৮১ উল্লেখ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে পারিবারিক বয়সের ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ে।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, বাকেরগঞ্জ থানার মামলা নং- ১৮/৮৫/২০০৫-৬ সহ তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। সম্প্রতি বরিশাল আদালতেও একটি সিআর মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত সংবাদসমূহে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভুয়া সনদ ব্যবহার, ভয়ংকর বয়স জালিয়াতি, একাধিক পরিচয় ব্যবহার, সরকারি চাকরির নীতিমালা লঙ্ঘন ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠে আসে। ফলে বিষয়টি বর্তমানে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে এবং জনমনে ব্যাপক উদ্বেগ ও আলোচনার সৃষ্টি করেছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভুয়া সনদ, জাল জন্মতারিখ, জাল ভোটার আইডি ও অন্য ব্যক্তিকে দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তারা অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ও প্রশাসনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত জালিয়াতি নয়; বরং সরকারি চাকরি, শিক্ষা ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় নথি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি ভয়ংকর প্রতারণা হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষক মোখলেছুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।


Side banner

সারাবাংলা বিভাগের আরো খবর

Link copied!