বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৬ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আধুনিক বাংলা কবিতায় নাগরিক জীবন, মানবিক অনুভূতি এবং সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরার কারণে তিনি বাংলাদেশের সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেন।
কবির নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকার বনানী কবরস্থানে তার মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পরিবার, স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা তার কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন। পাশাপাশি দেশে-বিদেশে থাকা কবিভক্তদের অংশগ্রহণে অনলাইন আয়োজনও হতে পারে।
শামসুর রাহমান ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে। পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর তিনি ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে অধ্যয়ন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই কবিতার প্রতি তার গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে সেই আগ্রহই তাকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী আধুনিক কবিতে পরিণত করে।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় শহীদ আসাদের রক্তাক্ত শার্ট শামসুর রাহমানকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই রচিত হয় তার বহুল আলোচিত কবিতা ‘আসাদের শার্ট’। এতে একটি রক্তাক্ত জামা প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও গণমানুষের সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তার কবিসত্তায় আরও গভীর পরিবর্তন আনে। যুদ্ধের সময় তিনি নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে অবস্থান করেন এবং রচনা করেন ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, মানুষের আত্মত্যাগ, রক্তক্ষয় ও মুক্তির স্বপ্ন এসব কবিতায় শক্তিশালীভাবে ফুটে ওঠে।
শুধু কবিতা নয়, সাংবাদিকতাতেও শামসুর রাহমানের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ১৯৫৭ সালে দৈনিক মর্নিং নিউজে কাজের মধ্য দিয়ে তার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু। পরে ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৮৭ সালে সেই দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার পর তিনি ‘অধুনা’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হন।
কবিতার পাশাপাশি শামসুর রাহমান উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, ছড়া ও অনুবাদ সাহিত্যেও কাজ করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘নিজ বাসভূমে’ এবং ‘বন্দী শিবির থেকে’।
তার লেখায় ব্যক্তিগত অনুভূতি, নগরজীবন, প্রেম, সামাজিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানুষের অধিকার বিভিন্ন সময় ভিন্ন মাত্রায় উঠে এসেছে। এ কারণে তার কবিতা একদিকে যেমন ব্যক্তিমানুষের অনুভূতি ধারণ করেছে, অন্যদিকে তেমনি সময় ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে শামসুর রাহমান বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। এর মধ্যে রয়েছে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক।
সাহিত্যচর্চার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ২০০৬ সালে তার জীবনাবসান হলেও তার কবিতা ও সাহিত্যকর্ম বাংলা ভাষাভাষী মানুষের পাঠ ও স্মৃতিতে এখনও সক্রিয়। বিশেষ করে ভাষা, স্বাধীনতা, গণমানুষের সংগ্রাম ও নাগরিক জীবনের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে লেখা তার কবিতাগুলো তাকে বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘস্থায়ী এক আসন দিয়েছে।
আজ তার ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে কবিপ্রেমী ও সাহিত্য অনুরাগীরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন আধুনিক বাংলা কবিতার এই বিশিষ্ট স্রষ্টাকে।
আপনার মতামত লিখুন :